আল্লাহর পথের পাথেয় (২)

ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর অধ্যাপক, আল-হাদীস বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া চেয়ারম্যান, আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট 

সৃষ্টির কল্যাণে রত থাকা ও হিংসামুক্ত কল্যাণ কামনা

কুরআন-হাদীসের আলোকে আমরা দেখি যে, কিছু মানসিক বা দৈহিক কর্ম আছে যা অতি সহজে আমাদেরকে আল্লাহর নৈকট্য ও সাওয়াব লাভে সাহায্য করে। এ সকল কর্ম পালন করলে যাকির অতি অল্প আমলে অধিক সাওয়াব অর্জন করতে পারেন। আমাদের উচিত এগুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখা। এজাতীয় কিছু কর্মের কথা আমরা ধারাবহিকভাবে আলোচনা করছি। আজ দ্বিতীয় পর্ব।


সৃষ্টির কল্যাণে রত থাকা:
আল্লাহর রহমত, বরকত ও সাওয়াব অর্জনের সহজতম পথ আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি, বিশেষত মানুষের প্রতি কল্যাণ ও উপকারের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। সকল জাগতিক প্রয়োজনে সাহায্য করা, সমাজের কিছু মানুষের মধ্যে পরস্পরে গোলমাল বা অশান্তি হলে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা, অসুস্থকে দেখতে যাওয়া, সেবা করা, বিপদে পড়লে উদ্ধার করা, মাযলূম হলে সাহায্য করা, মৃত্যুবরণ করলে কাফন-দাফনে শরীক হওয়া ইত্যাদি সকল প্রকার মানব সেবামূলক কাজের জন্য অকল্পনীয় সাওয়াব ও মর্যাদার কথা অগণিত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।


রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যতক্ষণ একজন মানুষ অন্য কোনো মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত থাকবে ততক্ষণ আল্লাহ তার কল্যাণে রত থাকবেন। আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় বান্দা যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে। আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় নেক আমল কোনো মুসলিমের হৃদয়ে আনন্দ প্রবেশ করান, অথবা তার বিপদ, কষ্ট বা উৎকণ্ঠা দূর করা, অথবা তার ঋণ আদায় করে দেওয়া, অথবা তার ক্ষুধা দূর করা। আমার কোনো ভাইয়ের কাজে তার সাথে একটু হেঁটে যাওয়া আমার নিকট মসজিদে এক মাস ইতেকাফ করার চেয়েও বেশি প্রিয়। যে ব্যক্তি তার কোনো ভাইয়ের সাথে যেয়ে তার প্রয়োজন মিটিয়ে দিবে কিয়ামতের কঠিন দিনে যেদিন সকলের পা পিছলে যাবে সেদিন আল্লাহ তার পা সুদৃঢ় রাখবেন। … এইরূপ অগণিত হাদীস আমরা হাদীসের গ্রন্থে দেখতে পাই। মুনযিরী, আত-তাগীব ৩/৩৪৬-৩৫১, মাজমাউয যাওয়াইদ ৮/১৯১, সহীহুল জামিয়িস সাগীব ১/৯৭।


হিংসামুক্ত কল্যাণ কামনা:
হৃদয়কে বিদ্বেষ, হিংসা ও অন্যের অমঙ্গল কামনা থেকে মুক্ত রাখা এমন একটি কর্ম যা মানুষকে অতিরিক্ত নফল ইবাদত ও যিক্র আযকার ছাড়াই জান্নাতের অধিকারী করে তোলে। আনাস (রা) বলেন, “একদিন আমরা রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে বসেছিলাম, এমতাবস্থায় তিনি বললেন : এখন তোমাদের এখানে একজন জান্নাতী মানুষ প্রবেশ করবেন। তখন একজন আনসারী মানুষ প্রবেশ করলেন, যাঁর দাড়ি থেকে ওযূর পানি পড়ছিল এবং তাঁর বাম হাতে তাঁর জুতাজোড়া ছিল। পরের দিনও রাসূলুল্লাহ সা. একই কথা বললেন এবং একই ব্যক্তি প্রবেশ করলেন। তৃতীয় দিনেও রাসূলুল্লাহ সা. প্রথম দিনের মতোই আবারো বললেন এবং আবারো একই ব্যক্তি প্রবেশ করলেন। তৃতীয় দিনে রাসূলুল্লাহ সা. মজলিস ভেঙ্গে চলে গেলে আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা) উক্ত আনসারী ব্যক্তির পিছে পিছে যেয়ে বলেন, আমি আমার পিতার সাথে মন কষাকষি করেছি এবং তিন রাত বাড়িতে যাব না বলে কসম করেছি। এ কয় রাত আপনার কাছে থাকতে দিবেন কি? তিনি রাজি হন। (আব্দুল্লাহর ইচ্ছা তিন রাত তাঁর কাছে থেকে তাঁর ব্যক্তিগত ইবাদত জেনে তদ্রƒপ আমল করা, যেন তিনিও জান্নাতী হতে পারেন)।
তিনি তিন রাত তাঁর সাথে থাকেন, কিন্তু তাঁকে রাত্রে উঠে তাহাজ্জুদ আদায় করতে বা বিশেষ কোনো নফল ইবাদত পালন করতে দেখেন না। তবে তিন দিনের মধ্যে তাঁকে শুধুমাত্র ভাল কথা ছাড়া কারো বিরুদ্ধে কোনো খারাপ কথা বলতে শোনেননি। আব্দুল্লাহ বলেন, আমার কাছে তাঁর আমল খুবই নগণ্য মনে হতে লাগল। আমি বললাম : দেখুন, আমার সাথে আমার পিতার কোনো মনমালিন্য হয়নি। তবে আমি পরপর তিনি দিন রাসূলুল্লাহ সা.-কে বলতে শুনলাম এখন একজন জান্নাতী মানুষ আসবেন এবং তিনবারই আপনি আসলেন। এজন্য আমি আপনার আমল দেখে সেইমতো আমল করার উদ্দেশ্যে আপনার কাছে তিন রাত্র কাটিয়েছি, কিন্তু আমি আপনাকে বিশেষ কোনো আমল করতে দেখলাম না! তাহলে কী কর্মের ফলে আপনাকে রাসূলুল্লাহ সা. জান্নাতী বললেন? তিনি বললেন: তুমি যা দেখেছ এর বেশি কোনো আমল আমার নেই, তবে আমি আমার অন্তরের মধ্যে কোনো মুসলমানের জন্য কোনো অমঙ্গল ইচ্ছা রাখি না এবং আমি কোনো কিছুর জন্য কাউকে হিংসা করি না। তখন আব্দুল্লাহ বলেন: এই কর্মের জন্যই আপনি এই মর্যাদায় পৌঁছাতে পেরেছেন।” হাদীসটি সহীহ। মুসনাদু আহমদ ৩/১৬৬, নাসাঈ, আস-সুনানুল কুবরা ৬/২১৫, মাজমাউয যাওয়াইদ ৮/৭৮-৭৯, মাকদিসী, আল-আহাদীসুল মুখতারাহ ৭/১৮৭, ইবনু আব্দিল বার, আত-তামহীদ ৬/১২১।


অন্য হাদীসে আনাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. আমাকে বলেন, “বেটা, যদি পার তবে এমনভাবে সকাল ও সন্ধ্যা করবে (জীবন কাটাবে) যে, তোমার হৃদয়ে কারো প্রতি কোনো বিদ্বেষ বা অমঙ্গল ইচ্ছা নেই। সম্ভব হলে এইরূপ চলবে, কারণ এইরূপ চলা আমার সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত। আর যে আমার সুন্নাতকে জীবিত করল, সে আমাকে ভালবাসল। আর যে আমাকে ভালবাসবে সে আমার সাথে জান্নাতে থাকবে।” হাদীসটির সনদে দুর্বলতা আছে, তবে ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। তিরমিযী (৪২-কিতাবুল ইলম, ১৬-বাবুল আখযি বিস সুন্নাহ) ৫/৪৪, নং ২৬৭৮, (ভারতীয় ২/৯৬)।


পাঠক হয়ত প্রশ্ন করতে পারেন যে, সংঘাতপূর্ণ জীবনে অনেক মানুষ আমাদেরকে কষ্ট দেন, হক্ব নষ্ট করেন, ক্ষতি করেন বা শত্র“তা করেন। অনেকে অকারণেও এগুলো করেন। এদের প্রতি বিদ্বেষ ও শত্র“তা থেকে হৃদয়কে কিভাবে বিরত রাখব ? আসলে বিষয়টি কঠিন বলেই তো সাওয়াব বেশি। তবে চেষ্টা করলে তা কঠিন থাকে না। মানবীয় স্বভাবের কারণে আমাদের মনে বিশেষ মুহূর্তে ক্রোধ, কষ্ট বা বিরক্তি আসবেই। তবে মনটা একটু শান্ত হলেই, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মনের মধ্য থেকে এ অনুভূতি দূর করার চেষ্টা করতে হবে। আল্লাহর কাছে নিজের জন্য ও যার কর্মে বা ব্যবহারে আমরা কষ্ট পেয়েছি তার জন্য ইস্তিগফার করতে হবে ও দু‘আ করতে হবে।


প্রয়োজনে নিজের হক্ক রক্ষার জন্য চেষ্টা করতে হবে। তবে অধিকার আদায়ের চেষ্টা বা কর্ম আর মনের হিংসা ও শত্র“তা এক নয়। এক ব্যক্তি আমার অধিকার নষ্ট করেছেন, আমি তার নিকট থেকে আমার অধিকার আদায়ের চেষ্টা করছি। কিন্তু তার সাথে আমার অন্য কোনো শত্র“তা নেই। আমি আমার অধিকার ফেরৎ পাওয়া ছাড়া তার কোনো প্রকার অমঙ্গল কামনা করি না। বরং আমি সর্বদা তার জন্য দু‘আ করি। এভাবে হৃদয়কে অভ্যস্ত করলে ইন্শা আল্লাহ আমরা উপরিউক্ত সাহাবীর মতো হতে পারব এবং রাসূলুল্লাহ সা.-এর সুন্নাত জীবিত করার সাওয়াব অর্জন করতে পারব।